বাংলা রিপোর্ট//রাষ্ট্র মেরামতে তারেক রহমানের ৩১ দফা: কী হবে প্রশাসনের ভূমিকা
নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোই তারেক রহমানের প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। মাঠ প্রশাসনকে জনকল্যাণমুখী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করে এই সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তবে এর সফলতার জন্য জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সামাজিক মন-মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৩১ দফার প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য
রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের এই রূপরেখা মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষিত ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং তারেক রহমান ঘোষিত ২৭ দফা কর্মসূচির একটি সংশোধিত ও সম্প্রসারিত রূপ। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই বিএনপি এই ৩১ দফার রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করে। এর মূল লক্ষ্য হলো সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা।
৩১ দফার মূল স্তম্ভ
বিএনপি ঘোষিত এই ৩১ দফায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র: প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে সব মত ও পথের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন।
ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা এবং পর পর দুই টার্মের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার বিধান।
সংসদে উচ্চকক্ষ: বিশিষ্ট নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সংসদে ‘উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা’ প্রবর্তন।
প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন: বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদক এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক কমিশন গঠন ও আইনি সংস্কার।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা: ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ মূলনীতি, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্য কার্ড চালু এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও বিশেষজ্ঞ মত
সাধারণ নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে এই ৩১ দফা বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য সংবিধান ও প্রশাসনিক সংস্কার যেমন প্রয়োজন— তেমনি প্রয়োজন ৩১ দফায় বিদ্যমান কিছু অস্পষ্টতা দূর করা।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, “৩১ দফা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন মেধা, সততা ও দেশপ্রেমনির্ভর একটি অরাজনৈতিক প্রশাসন। আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে— যেখানে পদোন্নতি ও নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হবে যোগ্যতা।”
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, “৩১ দফা বাস্তবায়নে সংবিধান ও প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য। তবে উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার মতো কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে, যা জনগণের কাছে আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অস্পষ্টতা রেখে কোনও বড় সংস্কার টেকসই হয় না।”
প্রশাসনিক সংস্কারের রূপরেখা
সংশ্লিষ্টদের মতে, ৩১ দফা বাস্তবায়নে একটি ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। মূলত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোই তারেক রহমানের প্রস্তাবিত এই সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব করে তুলতে পারে।
বিএনপি মনে করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সমর্থন থাকলে এই ৩১ দফার মাধ্যমেই দেশের বিদ্যমান সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।