আন্তর্জাতিক ডেস্ক : শান্তি চুক্তির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যা সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে। পশ্চিম এশিয়াজুড়ে শত্রুতা শেষ করার লক্ষ্যে দুপক্ষের মধ্যে হওয়ার সমঝোতা চুক্তির আওতায় লেবাননে লড়াইয়ে একটি টেকসই বিরতি শুরু হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এসব ঘটনা এমন এক সপ্তাহান্তের পর ঘটেছে যা সপ্তাহখানেক আগের চুক্তিটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকায় সমঝোতা চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদের লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল আর তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আবার যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়েছিলেন।
কিন্তু তেমন কিছু না ঘটে ঘটনাপ্রবাহ শান্তি চুক্তির দিকে এগোতে থাকায় সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল বাড়তে শুরু করেছে আর তেলের দাম কমতে শুরু করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য একটি ভালো ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে, অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হলেও তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচী নিয়ে কোনো আলোচনা শুরু করেনি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ ও লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ পুরো বিশ্ব বাজারকে কাঁপিয়ে দিয়েছে আর বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। সোমবার ভ্যান্স অগ্রগতির কথা জানানোর পর তেলের দাম কমতে শুরু করেছে।
ব্যুর্গেনস্টকে কাতারি মালিকানাধীন সুইস পার্বত্য রিজোর্টে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ভিত্তিতে দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর রূপরেখায় সম্মত হয়েছে।
তারা লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত প্রতিরোধ শক্তি হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই অবসানে একটি প্রক্রিয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে আর হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত এড়িয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সাহায্য করার জন্য তাদের মধ্যে একটি যোগাযোগ লাইনও চালু হয়েছে।
ইরানকে অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়ার জন্য চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত এসব পদক্ষেপের প্রথম কয়েকটি মধ্যে ২১ অগাস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সময় ইরান তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি করে সেগুলোর মূল্য গ্রহণ করতে পারবে।
সুইজারল্যান্ডের রিজোর্টে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসানে একটি চুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আয়োজিত লেক লুসার্ন শীর্ষ সম্মেলনে বৈঠক শুরুর আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সামনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে করমর্দন করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স
সুইজারল্যান্ডের রিজোর্টে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসানে একটি চুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আয়োজিত লেক লুসার্ন শীর্ষ সম্মেলনে বৈঠক শুরুর আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সামনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে করমর্দন করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স
ভ্যান্সের আশাব্যঞ্জক মূল্যায়ন
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে আশাবাদী সুরে কথা বলতে থাকা ভ্যান্স জানিয়েছেন, তেহরান পারমাণবিক পরিদর্শকদের অনুমোদন দিতে, বিদেশে জব্দ থাকা তাদের সম্পদ পরিচালনার জন্য প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে ও যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থাপনা করতে সম্মত হয়েছে।
ব্যুর্গেনস্টকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আমরা ভালো একটি ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছি।”
তবে ভ্যান্স এমনটি বললেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাকায়ি দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-কে বলেছেন, ইরান পারমাণবিক বিষয় নিয়ে এখনও কোনো আলোচনা করেনি আর নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।
সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন যে ‘পারমাণবিক সততা’ নিশ্চিত করতে ইরান অস্ত্র পরিদর্শনে সম্মত হবে।
পরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “যদি ইরান তাদের চুক্তি মেনে না চলে অথবা তারা যদি ঠিকমতো আচরণ না করে তবে আমরা যা করা দরকার আমি তাই করবো।”
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দফা বিমান হামলা চালানোর পর থেকে ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শন সীমিত করেছে আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তা পুরোপুরি স্থগিত করেছে। ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচী শান্তিপূর্ণ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিম মাধ্যমে জানিয়েছেন, ইরান তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড়, বিদেশে তাদের কিছু জব্দ সম্পদ অবমুক্ত এবং ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে।
ভ্যান্স জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউজের দূত ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার একটি প্রক্রিয়া উপস্থাপন করেছেন আর তাতে ইরানের জব্দ তহবিল অবমুক্ত হলেও তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে আর সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভুট্টা, সয়াবিন ও গম আমদানিতে ব্যয় করা যাবে।
“তাই, যেই অর্থ আমরা অবমুক্ত করবো তা আমাদের কৃষকদের কাছে যাবে,” সাংবাদিকদের বলেছেন ট্রাম্প।
কিন্তু ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এবং অবশিষ্ট জব্দ তহবিলের অন্তত কিছু অংশ নিষেধাজ্ঞা নেই অন্য এমন পণ্য কিনতে ব্যবহার করা হতে পারে।
চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা আছে।